Pages

Wednesday, May 9, 2012

শেষ পর্যন্ত মা-ই ভরসা...


মেয়ে অফিসে, তাই নাতনি অহনাকে পড়াচ্ছেন সবিতা দাশ মেয়ে অফিসে, তাই নাতনি অহনাকে পড়াচ্ছেন সবিতা দাশ
মেয়েরা উচ্চশিক্ষিত হচ্ছে। যোগ্যতা প্রমাণ করে সব ধরনের পেশায় অংশগ্রহণ করছে। কিন্তু মেয়েটি যখন বিয়ের পর মা হচ্ছেন, তখন সন্তান কোথায় রাখবেন? শহরে যৌথ পরিবারের সংখ্যা দিন দিন কমে বাড়ছে একক পরিবারের সংখ্যা। এ ভাবনায় কেউ কেউ চাকরিও ছেড়ে দিচ্ছেন। নারীর ক্ষমতায়নের কথা দিকে দিকে উচ্চারিত। তবে সামাজিক অবকাঠামো এখনো কর্মজীবী মায়ের অনুকূলে নয়। কেননা এ দেশে নেই ভালো মানের শিশুদিবাযত্নকেন্দ্র। অনেক ক্ষেত্রে
গৃহপরিচারিকার কাছেও সন্তান রাখতে নিরাপদ বোধ করেন না মা-বাবা। ফলে বাধ্য হয়ে রাখতে হচ্ছে মা-শাশুড়ির কাছে। কর্মজীবী মেয়েটির শেষ পর্যন্ত মা-ই ভরসা। মা-শাশুড়ির সহযোগিতায় কর্মক্ষেত্রে সফল এমন চারজন নারীর কথা জানাচ্ছেন তৌহিদা শিরোপা।
মা দিবস উপলক্ষে নারীমঞ্চের বিশেষ আয়োজন।

  • যশের সঙ্গে দাদি হাবিবা আহমেদ যশের সঙ্গে দাদি হাবিবা আহমেদ
    ছবি: সৈকত ভদ্র

মা না থাকলে চাকরি করা সম্ভব হতো না
বিটপী দাশ চৌধুরী
হেড অব করপোরেট অ্যাফেয়ার
স্ট্যান্ডার্ড চার্টার্ড, বাংলাদেশ
‘আমার জীবনে মায়ের ভূমিকার কথা বলে শেষ করা যাবে না। সবিতা দাশ আমার মা। সেই ছোটবেলা থেকে এ পর্যন্ত তিনি সহযোগিতা-সমর্থন দিয়েই চলেছেন। কিসে আমার ভালো হবে, সেটিই যেন তাঁর একমাত্র চাওয়া। একসময় আমার জন্য যে পরিশ্রম করেছেন, এখন তা করছেন আমার মেয়ে অহনা অনুপমা চৌধুরীর জন্য।’ বলেন স্ট্যান্ডার্ড চার্টার্ড বাংলাদেশের হেড অব করপোরেট অ্যাফেয়ার বিটপী দাশ চৌধুরী। ‘প্রায় ৩০ বছর মা-বাবা শান্তিনগরে ছিলেন। দীর্ঘদিনের চেনা পরিচিত এলাকা, প্রতিবেশী ছেড়ে শুধু আমার মেয়ের কারণে উত্তরায় চলে এসেছেন তাঁরা। কখনো মা, কখনো বাবা—এভাবেই পালাক্রমে অহনাকে স্কুল থেকে নিয়ে আসেন। এরপর ওর দেখাশোনা করা, খাওয়ানো এমনকি লেখাপড়া ও মায়ের কাছেই করে। রাতে অফিস থেকে ফেরার সময় আট বছর বয়সী অহনাকে নিয়ে আসি। দেখা যায় মেয়েটা শুধু ঘুমায় আমাদের সঙ্গে। কিন্তু নানির কাছে থাকায় মায়ের অভাবটা তেমন টের পায় না। মাঝে অবশ্য দুই বছর ওকে একটা শিশুদিবাযত্নকেন্দ্রে রেখেছিলাম। 

বিটপী দাশ চেৌধুরী
বিটপী দাশ চেৌধুরী
মা উত্তরা চলে আসার পর তাঁর কাছেই থাকে। মা না থাকলে চাকরি করা মনে হয় সম্ভব হতো না। এমনও হয়েছে, মা হয়তো এক দিন স্কুল থেকে কোনো কারণে অহনাকে আনতে পারেননি। আমার ওকে স্কুল থেকে আনতে যাওয়ার কথা। হঠাৎ জরুরি মিটিং পড়ে গেল। কাজে আটকা পড়লাম। মেয়েকে আনতে দেরি হয়ে যাওয়ায় সে ভয় পেয়ে যায়। মা না থাকলে এ রকম কতশত পরিস্থিতি হতো, কে জানে। আমাদের দেশের প্রেক্ষাপটে মায়ের সহযোগিতা মেয়েদের জীবনে খুব প্রয়োজন, বিশেষ করে সন্তান হওয়ার পর। কেননা এ দেশে ভালো মানের তেমন কোনো শিশুদিবাযত্নকেন্দ্র নেই। কাজের লোকের কাছেও সন্তানকে রেখে যাওয়া নিরাপদ নয়। ফলে রাষ্ট্রের পক্ষ থেকে শিশুদিবাযত্নকেন্দ্র তৈরিতে এগিয়ে আসতে হবে। অবশ্যই তা যুগোপযোগী হতে হবে। এসবের তত্ত্বাবধানের জন্য নীতিমালা থাকতে হবে। এ ছাড়া প্রথম সারির বেসরকারি ও করপোরেট প্রতিষ্ঠানের মালিকদেরও তাঁদের কর্মীর ভালোমন্দের কথা বিবেচনা করে সেখানে শিশুদিবাযত্নকেন্দ্র গড়ে তোলা উচিত। কর্মীরা নিশ্চিন্তে কাজ করতে পারবেন। আরও বেশি কাজ করতে আগ্রহী হবেন তাঁরা।’ফারহানা মাহবুব ফারহানা মাহবু
আমার সন্তান পারিবারিক পরিবেশে বড় হচ্ছে
ফারহানা মাহবুব
মানবসম্পদ নির্বাহী, এসিআই
‘চার মাস ১০ দিনের ছেলেকে রেখেই অফিসে যেতে হয়েছে। আমার শাশুড়ি ও মা না থাকলে মাতৃত্বকালীন ছুটি শেষে হয়তো কাজে ফেরা হতো না। আমার শুধু ক্যারিয়ারের জন্য এই সহযোগিতা গুরুত্বপূর্ণ, তা নয়; এর থেকেও বড় বিষয়, সন্তান পারিবারিক পরিবেশে বড় হচ্ছে। নিরাপদে থাকছে।’ এসিআইয়ের মানবসম্পদ নির্বাহী ফারহানা মাহবুব বলছিলেন তাঁর নিজের জীবনের কথা। সবার কাছে পরিচিত ফাবিন নামে। 

তাসনিমকে নিয়ে নানি হাসিনা বেগম
তাসনিমকে নিয়ে নানি হাসিনা বেগম
সাড়ে ১০ মাস বয়সের যশ আলেন্দে আহমাদকে কখনো মায়ের বাসায়ও রেখে যান। বেশির ভাগ সময় অবশ্য শাশুড়ির কাছেই থাকে। ‘আমার মায়ের বাসায় রেখেও যাই মাঝেমধ্যে। আসলে ঢাকা শহরের যানজটের মধ্যে সন্তান আনা-নেওয়া করাও তো ঝামেলার। সকালে আমার ননদের কাছে দিয়ে অফিসে চলে যাই। শাশুড়ি স্কুলে শিক্ষকতা করেন। আমার ননদ অফিসে যাওয়ার আগে শাশুড়ি চলে আসেন। মাঝেমধ্যে ঘণ্টা দুই হয়তো কাজের লোকের কাছে থাকতে হয়। দেখা যায়, আমার মা-ও কোনো কোনো দিন সকালে এসে নিয়ে যান, আবার সন্ধ্যায় দিয়ে যান। আসলে এই অপরিসীম সহযোগিতা, সমর্থন না থাকলে কী হতো, ভাবতে পারি না। উচ্চশিক্ষিত হয়েও হয়তো ঘরে বসে থাকতে হতো। আর গৃহপরিচারিকার কাছে সন্তান রেখে তো অফিসে নিশ্চিন্তে থাকা সম্ভব না। দাদি-নানির কাছে বেড়ে উঠলে মানসিক বিকাশ সঠিকভাবে হবে। 
  • আলেয়া ফেরদেৌসী আলেয়া ফেরদেৌসী


    • মেয়ে অফিসে, তাই নাতনি অহনাকে পড়াচ্ছেন সবিতা দাশ মেয়ে অফিসে, তাই নাতনি অহনাকে পড়াচ্ছেন সবিতা দাশ
      ছবি: খালেদ সরকার
    • যশের সঙ্গে দাদি হাবিবা আহমেদ যশের সঙ্গে দাদি হাবিবা আহমেদ
      ছবি: সৈকত ভদ্র
    • বিটপী দাশ চেৌধুরী বিটপী দাশ চেৌধুরী
    • ফারহানা মাহবুব ফারহানা মাহবুব
    • তাসনিমকে নিয়ে নানি হাসিনা বেগম তাসনিমকে নিয়ে নানি হাসিনা বেগম
     সেটা গৃহপরিচারিকার কাছে থাকলে সম্ভব না। আমার ছেলের খাওয়া, গোসল, ঘুম—কোনো কিছু নিয়েই ভাবতে হয় না। এমনকি নিজের জন্যও কিছু সময় পাওয়া যায়। সামাজিক অনুষ্ঠান তো লেগেই থাকে। ছোট বাচ্চা নিয়ে সব জায়গায় যাওয়া যায় না। তখনো নিশ্চিন্তে চলে যাই। শাশুড়ি বা মায়ের কাছে সে ভালো আছে—এতটুকু ভরসা পাই। এখন যত মনোযোগ দিয়ে কোনো রকম দুশ্চিন্তা ছাড়া কাজ করতে পারছি, শাশুড়ি বা মা না থাকলে কোনোভাবেই এটি সম্ভব হতো না। থমকে যেত আমার কর্মজীবন। সবার অবশ্য এই সুযোগ-সুবিধা পাওয়ার সৌভাগ্য হয় না। আমার মনে হয়, শিশুদের জন্য দিবাযত্নকেন্দ্র নিয়ে সরকারের সুনির্দিষ্ট নীতিমালা করতে হবে। এ ছাড়া মাতৃত্বকালীন ছুটিও সব প্রতিষ্ঠানে ছয় মাস বাধ্যতামূলক করে দেওয়া উচিত।’
    হেলেন দাশের স্নেহে মেয়ের তিন সন্তান
    হেলেন দাশের স্নেহে মেয়ের তিন সন্তান

    ছেলের সন্তান যশকে শুধু নয়, স্কুলশিক্ষক হাবিবা আহমেদ মেয়ের সন্তানেরও দেখভাল করেন। ‘ইচ্ছা থাকা সত্ত্বেও আমার সন্তানেরা ছোট থাকার সময় চাকরি করতে পারিনি। ওরা বড় হওয়ার পর চাকরি শুরু করেছি। আমার শাশুড়ি ছিলেন অসুস্থ। সে রকম দায়িত্বশীল কাউকে পাইনি, যার কাছে ওদের রাখতে পারব। এই অসুবিধায় যেন ছেলের বউ বা মেয়েকে পড়তে না হয় সেটি ভেবেছি। ছেলের বউ আমার মেয়ের মতোই। ওর ভালো-মন্দ দেখার দায়িত্ব আমার। উচ্চশিক্ষিত একটা মেয়ে শুধু সন্তানের জন্য চাকরি করবে না, তা তো হয় না। সর্বোচ্চ সহযোগিতাটুকু করার চেষ্টা করি। নাতিদের ছাড়া এখন ভালো লাগে না। কীভাবে সময় কেটে যায় বুঝতেই পারি না। যখন নানির বড়িতে যায়, কেমন ফাঁকা ফাঁকা লাগে। এর সঙ্গে এত অভ্যস্ত যে নাতিদের ছাড়া থাকতে পারব না। আমি যা পারিনি, ছেলের বউ সেটি পারছে। এটি অনেক আনন্দের আমার কাছে।’

    মায়ের আশ্বাসে নির্ভার আমি

    আলেয়া ফেরদৌসী
    অ্যাসিস্ট্যান্ট ম্যানেজার গ্রান্টস, মানুষের জন্য ফাউন্ডেশন

    লিন্ডা কামার
    লিন্ডা কামার

    ‘একবার, অফিসের কাজে ঢাকার বাইরে পাঁচ দিন থাকতে হবে। মেয়ের গায়ে জ্বর দেখে মা অভয় দিলেন কোনো চিন্তা না করার। মায়ের কাছে আশ্বাস পেয়ে আমিও নির্ভার হয়ে চলে গেলাম। এ রকম কত ঘটনা যে আছে, বলে শেষ করা যাবে না। আমার তিন বছর বয়সী মেয়ে তাসনিম ফেরদৌসের জন্য মা আজিমপুর ছেড়ে মিরপুরে আমার বাসার কাছে বাড়িভাড়া নিয়েছেন।’ মানুষের জন্য ফাউন্ডেশনের অ্যাসিস্ট্যান্ট ম্যানেজার গ্রান্টস আলেয়া ফেরদৌসী বলছিলেন কথাগুলো। ‘আসলে আমার মা হাসিনা বেগম না থাকলে কী হতো ভাবতে পারি না। চাকরি করা হতো না আমার। এসব ক্ষেত্রে সন্তানের জন্য মাকেই ত্যাগ স্বীকার করতে হয়। কেননা, কাজের লোকের কাছে সন্তান বেড়ে উঠছে কিংবা রাখার কথা এখন ভাবতেই পারা যায় না। নিরাপত্তাহীনতায় ভুগি। আর মায়ের কাছে ওর সব চাহিদা পূরণ হচ্ছে। ওর থাকা, খাওয়া, ঘুমানো কোনো কিছু নিয়ে ভাবতে হয় না আমাকে। মাঝেমধ্যে অফিস থেকে ফিরে ক্লান্ত হয়ে যাই। দেখা যায়, মা রান্নাও করে দিয়েছেন। আমার মা ঢাকায় থাকায় এই সুবিধা পাচ্ছি। মেয়েদের এগিয়ে নিতে হলে অফিসগুলোতে শিশুদিবাযত্নকেন্দ্র করতে হবে। সবার তো আর্থিক সামর্থ্য না-ও থাকতে পারে বাইরের কোনো দিবাযত্নকেন্দ্রে রাখার। এতে করে কর্মী প্রতিষ্ঠানের প্রতি কৃতজ্ঞ থাকে। তা না হলে সন্তান রাখার ঝামেলায় অনেকে চাকরি ছেড়ে দেন। প্রতিষ্ঠানও একজন ভালো কর্মী হারায়। প্রতিষ্ঠান একটু দায়িত্ব নিলেই এই সমস্যার সমাধান সম্ভব।’

    মায়ের সহযোগিতার কোনো তুলনা নেই

    লিন্ডা কামার
    ডেভেলপমেন্ট কমিউনিকেশন অ্যান্ড আউটরিচ অ্যাসিস্ট্যান্ট, ইউএসএআইডি, বাংলাদেশ
    লিন্ডা কামারের সঙ্গে মা হেলেন দাশের সন্তান রাখা নিয়ে একটা গোপন চুক্তি ছিল। লিন্ডা যখন প্রথম সন্তানের মা হতে যাচ্ছেন, তখন তিনি বলেছিলেন, ‘যদি তুমি মাস্টার্স শেষ করো, তাহলে আমি তোমার সন্তানকে দেখব।’ শুধু তা-ই নয়, মেয়ের সন্তানের জন্য হেলেন দাশ ঢাকার ওয়াইডব্লিউসিএ স্কুলের দীর্ঘদিনের শিক্ষকতা পেশা ছেড়ে দেন। মেয়ের সুবিধার জন্য তাঁর সঙ্গেই থাকেন মা-বাবা। প্রিয়তা, প্রমিত ও প্রিয়ানসি—লিন্ডার তিন সন্তানের দেখভালের পুরো দায়িত্বই হেলেন দাশের ওপর। ইউএসএআইডি বাংলাদেশের ডেভেলপমেন্ট কমিউনিকেশন অ্যান্ড আউটরিচ অ্যাসিস্ট্যান্ট লিন্ডা কামার বলেন, ‘মা না থাকলে আসলে সংসার-সন্তান সামলে কিছুই করা হতো না আমার। শুধু আমার তিন সন্তানের কথা ভেবে মা-বাবা আমার সঙ্গে থাকেন। ওদের যত্ন-আত্তি থেকে শুরু করে নানা আবদার মায়ের কাছেই। প্রিয়তাকে রেখে এক মাসের জন্য যুক্তরাষ্ট্রে একটা প্রশিক্ষণ করতে যেতে হয়েছিল। মা ছিলেন বলেই এটি সম্ভব হয়েছে। নির্ভাবনায় আমি গিয়েছি। আমার শাশুড়ি ঢাকার বাইরে থাকেন। তাঁর পক্ষেও সন্তানদের সঙ্গে থাকা সম্ভব নয়। তবে মা-বাবা শিগগির তাঁদের নিজস্ব ফ্ল্যাটে চলে যাবেন। আমরা তখন তাঁদের কাছাকাছি বাসা নেব। তবুও কীভাবে সব সামলাব ভাবলেই দুশ্চিন্তা হতে থাকে।’ লিন্ডা বলেন, ‘মায়েরা আসলে জীবনের সব পর্যায়ে মেয়েদের পাশে থাকেন। এই সমর্থন-সহযোগিতার সঙ্গে কোনো কিছুর তুলনা হয় না। তবে সবচেয়ে ভালো হয়, যদি কর্মক্ষেত্রে শিশুকে রাখার ব্যবস্থা করা হয়। নিশ্চিন্তে কাজ করা যাবে। কাজের মানও ভালো হবে।’

    No comments:

    Post a Comment