Pages

Tuesday, April 24, 2012

নতুন উচ্চতায় সালমান

  • যুক্তরাষ্ট্রের টাইম ম্যাগাজিন নির্বাচিত বিশ্বের প্রভাবশালী ১০০ ব্যক্তির মধ্যে স্থান করে নিয়ে� যুক্তরাষ্ট্রের টাইম ম্যাগাজিন নির্বাচিত বিশ্বের প্রভাবশালী ১০০ ব্যক্তির মধ্যে স্থান করে নিয়েছেন বাংলাদেশি বংশোদ্ভূত সালমান খান
  • শিক্ষকের ভূমিকায় সালমান শিক্ষকের ভূমিকায় সালমান
যুক্তরাষ্ট্রের টাইম ম্যাগাজিন বর্তমান পৃথিবীর সবচেয়ে প্রভাবশালী ১০০ ব্যক্তির সমপ্রতি যে তালিকা প্রকাশ করেছে, যাতে মার্কিন প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামা, মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী হিলারি ক্লিনটন, ধনকুবের ওয়ারেন বাফেটের মতো ব্যক্তিদের পাশে উঠে এসেছে বাংলাদেশি বংশোদ্ভূত তরুণ সালমান খানের নাম!

খান একাডেমির প্রতিষ্ঠাতা সালমান খানের প্রশংসায় পঞ্চমুখ আজ গোটা বিশ্ব। টাইমের এই তালিকায় সালমানের জীবনী লিখেছেন স্বয়ং বিল গেটস। অথচ যাঁকে নিয়ে আজ এত হইচই, সেই সালমান আজ থেকে সাত বছর আগেও জানতেন না তাঁর জন্য ভবিষ্যৎ কী নিয়ে অপেক্ষা করছে! ম্যাসাচুসেটস ইনস্টিটিউট অব আইটি (এমআইটি) থেকে তিন বিষয়ে স্নাতক আর হার্ভার্ড বিজনেস স্কুল থেকে এমবিএ শেষ করে তাঁর দিনরাত ব্যবসা জগতের জটিল হিসাব-নিকাশেই কেটে যেত। নিয়মমাফিক জীবনে বাদ সাধল ছোট্ট কাজিন নাদিয়া, অঙ্ক নিয়ে বড়ই হিমশিম খাচ্ছে সে। অগত্যা বড় ভাই সালমান সিলিকন ভ্যালির অ্যাপার্টমেন্টে বসে ইন্টারনেটে নিউ অরলিন্সে থাকা নাদিয়াকে অঙ্ক শেখানো শুরু করলেন। আস্তে আস্তে আরও অনেকে সালমানের কাছে পড়তে আগ্রহী হয়ে উঠল। এতজনকে কীভাবে একসঙ্গে শেখানো যায়! ভাবতে ভাবতে সালমান কিছু টিউটরিয়াল ভিডিও বানিয়ে ইউটিউবের ওয়েবসাইটে তুলে দিলেন। সেটা ২০০৬ সালের কথা। আর পেছন ফিরে তাকাতে হয়নি তাঁকে। ভিডিওগুলোর জনপ্রিয়তা আর এভাবে পাঠদানের সম্ভাবনা বুঝতে পেরে ২০০৯ সালে সবকিছু ছেড়ে পরিপূর্ণভাবে আত্মনিয়োগ করে শুরু করেন ‘খান একাডেমি’।
২০০৯ সালেই মাইক্রোসফটের পক্ষ থেকে সালমান লাভ করেন শিক্ষা ক্ষেত্রে প্রযুক্তি ব্যবহারের জন্য সম্মানসূচক পুরস্কার। ২০১০ সালে গুগল খান একাডেমির ভিডিওগুলোকে পৃথিবীর বিভিন্ন ভাষায় অনুবাদের জন্য ২০ লাখ ডলারের অর্থ সহায়তা প্রদান করে। একই বছর ফোর্বস ম্যাগাজিনের প্রকাশিত ৪০ বছরের কম বয়সী পৃথিবীর সবচেয়ে সম্ভাবনাময় ৪০ জন ব্যক্তির তালিকায় নিজের স্থান করে নেন সালমান। বিল গেটসের উপস্থাপনায় টিইডি সম্মেলনে খান একাডেমি নিয়ে বক্তব্য দেন তিনি।
একের পর এক সম্মানসূচক অর্জনের ধারাবাহিকতায় এবার যোগ হলো আরেকটি নতুন পালক, টাইম ম্যাগাজিনের প্রভাবশালী ১০০ জনের তালিকায় স্থান করে নেওয়া। বিশ্বজুড়ে নতুন প্রজন্মের কাছে তিনি এখন এক অনুকরণীয় ব্যক্তিত্ব। তাই বিখ্যাত বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর সমাবর্তন বক্তা হিসেবেও ডাক পড়ছে সালমানের। আগামী মাসেই যুক্তরাষ্ট্রের রাইস বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাবর্তনে বক্তব্য দেবেন তিনি, জুনে যাবেন তাঁর নিজের বিশ্ববিদ্যালয়, এমআইটিতে।
শুধু বড় বড় পুরস্কার আর সম্মাননাই নয়, সালমান খান এক বৈপ্লবিক শিক্ষাপদ্ধতির সূচনা করে জয় করে নিয়েছেন সাধারণ মানুষের হূদয়। প্রতিমাসে অসংখ্য মানুষের চিঠি আর ই-মেইল আসে খান একাডেমিতে। এক মা সালমানকে লিখে জানান, ‘আমার একটি ১২ বছরের অটিস্টিক ছেলে আছে। অঙ্ক করতে খুব সমস্যা হয় ওর। আমরা কোনো কিছুই চেষ্টা করতে বাদ রাখিনি। অনেক কিছু কিনে এনেছি, অনেক কিছু ব্যবহার করে ওকে শেখাতে চেয়েছি, কিন্তু পারিনি। একদিন ইন্টারনেটে এই ভিডিওগুলো আমার চোখে পড়ে। প্রথমে দশমিকের ভিডিওটা আমি ওকে দেখাই। মনে হলো, ও বেশ বুঝতে পারছে! তারপর আমরা ভগ্নাংশ শুরু করি। আমার ছেলে যে এখন কত খুশি, আমি তা বোঝাতে পারব না!’ এমন অনেক ভালোবাসায় প্রতিনিয়ত সিক্ত হন সালমান। ব্লুমবার্গ বিজনেসউইক তাঁকে নিয়ে লিখেছে, ‘খান একাডেমিই সম্ভবত পৃথিবীর সবচেয়ে বেশি জনপ্রিয় টিউটরিয়াল-ভিত্তিক ওয়েবসাইট। প্রতিমাসে যেখানে এমআইটির তৈরি ‘ওপেনকোর্সওয়্যার’ সাইট প্রায় ১০ লাখ মানুষ ব্যবহার করে, সেখানে খান একাডেমির ব্যবহারকারী ২০ লাখ ছাড়িয়ে গেছে অনেক আগেই।’
ইন্টারনেট-ভিত্তিক এক জরিপে বর্তমানে সবচেয়ে জনপ্রিয় শিক্ষামূলক পাঁচটি ওয়েবসাইটের মধ্যে অনলাইন বিশ্বকোষ উইকিপিডিয়া, বিবিসির ইংরেজি ভাষা শেখার প্রোগ্রম আর ভিন্নধর্মী বক্তৃতার অনন্য সংকলন টিইডি টকসের পাশাপাশি রয়েছে সালমানের খান একাডেমি।
টাইম ম্যাগাজিন এক প্রবন্ধে সালমান খানকে তুলনা করেছে এন্ড্রু কার্নেগির সঙ্গে, যিনি সেই ১৯০০ শতাব্দীতে নিজের চেষ্টায় সারা মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে গড়ে তুলেছিলেন প্রায় এক হাজার ৭০০ গণগ্রন্থাগার। মার্কিনিদের কাছে এ শতাব্দীর এন্ড্রু কার্নেগি এখন বাংলাদেশি বংশোদ্ভূত সালমান খান।
এবারের টাইমের প্রকাশিত তালিকায় উঠে এসেছে ৩৭টি দেশের খ্যাতনামা ব্যক্তিদের নাম। যে তালিকায় আছেন অ্যাপলের সিইও টিম কুক, ফেসবুকের সিওও শেরিল স্যান্ডবার্গ কিংবা ফুটবলের তরুণ জাদুকর লিওনেল মেসি, সেই তালিকায় নিজের স্থান করে নিয়ে সালমান গর্বিত করেছেন বাংলাদেশকে। খান একাডেমির মাধ্যমে তিনি এ দেশের হাজারো সম্ভাবনাময় তরুণকে স্বপ্ন দেখতে উজ্জীবিত করছেন। অর্থ, ক্ষমতা বা খ্যাতির জন্য অন্য উপায় বেছে না নিয়ে, বিতর্কের ঊর্ধ্বে উঠেও যে কতটা প্রভাবশালী হওয়া যায়, তা-ই আরেকবার প্রমাণ করে দিলেন তিনি। সব সময় প্রচলিত নিয়মে পথ চলাই যে সবকিছু নয়, নিয়মনীতিকে ভেঙেচুরে নতুন কিছু গড়ে যে সত্যিই পৃথিবীকে বদলে দেওয়া যাতে পারে, আজ তার অনন্য উদাহরণ আমাদের গৌরব সালমান খান।
swapno.lekhok@gmail.com

 সূত্র: প্রথমআলো.২৫/০৪/২০১২

No comments:

Post a Comment