বয়স
তখন সবে ১৬ বছর। অশোক রাঠোরের তখন স্বপ্ন ছিল বটে, তবে তা ডাক্তার কিংবা
প্রকৌশলী হওয়ার নয়। ভারতের মুম্বাইয়ের এক বস্তির বাসিন্দা অশোকের স্বপ্ন
ছিল বড় হয়ে স্কুল বা কোনো অফিসের পিয়ন হবে, প্রতিদিন সকালে অফিসে যাবে,
আর মাস শেষে বেতন পাবে। কিন্তু
নতুন কিছু করার সাহস আর কঠোর পরিশ্রম যে
একজনের জীবনের গল্প কীভাবে বদলে দিতে পারে, তার এক জ্বলন্ত উদাহরণ তিনি।
অশোক আজ আর সাধারণ কেউ নন, তিনি অস্কার (অর্গানাইজেশন ফর সোশ্যাল চেঞ্জ,
অ্যাওয়্যারনেস অ্যান্ড রেসপনসিবিলিটি) নামের একটি সংগঠনের প্রতিষ্ঠাতা।
যেসব শিশু-কিশোর স্কুলের পড়া শেষ না করেই বেঁচে থাকার সংগ্রামে জড়িয়ে
পড়ে, সেই ঝরে পড়া ছেলেমেয়েদের পড়াশোনা শিখিয়ে তাদের জীবনের গতিপথ বদলে
দেওয়াই অস্কারের লক্ষ্য। অশোকের জন্ম আম্বেদকার নগরে, যা প্রায় ১২ হাজার মানুষের এক বিশাল বস্তি এলাকা। বস্তির ভেতরে সরকারি স্কুল আছে বটে, কিন্তু পঞ্চম শ্রেণী পাস করতে না-করতেই ছেলেরা স্কুল ছেড়ে লেগে পড়ে ছোটখাটো কাজে। মেয়েদের অবস্থা আরও খারাপ, বস্তির বেশির ভাগ মেয়ে কখনো স্কুলের চৌকাঠও মাড়ায় না। ১০-১২ বছরের ছেলেরা যখন মাছের আড়তে কাজ করে দৈনিক ২০০ রুপি আয় করা শুরু করে, তখন বাবা-মায়েরাও আর পড়াশোনার জন্য চাপ দেন না, ভাবেন, অভাবের সংসারে একটু বাড়তি টাকা এলে ক্ষতি কি! এভাবেই বেড়ে ওঠে আম্বেদকার নগরের বস্তি এলাকার ছেলেমেয়েরা।
অনলাইনে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে অশোক বলেন, ‘আমরা দুই ভাই, এক বোন। আমি সবার ছোট। আমার বড় ভাই ও বোন কেউই স্কুল শেষ করতে পারেনি। আমার বয়স যখন ১০, তখন বন্ধুবান্ধবের দেখাদেখি আমিও স্কুল ছেড়ে কয়েক দিন মাছের আড়তে কাজ করলাম। আমাকে স্কুল ছেড়ে দিতে দেখে মাছ ব্যবসায়ী বাবা একদিন দুঃখ করে বললেন, তাঁর তিন ছেলেমেয়ের একজনও মানুষ হলো না। বাবাকে মন খারাপ করতে দেখে আমি আবার কাজ ছেড়ে স্কুলে ফিরে যাই।’
এভাবেই কেটে যাচ্ছিল কিশোর অশোকের দিনগুলো। বন্ধুরা মাছের আড়তে কাজ করে ভালোই আয় করছিল। ১৫-১৬ বছর বয়স হতে না-হতেই অশোকের বন্ধুদের হাতে উঠে আসে সিগারেট আর সস্তা মদ।
অশোক বলেন, ‘সবই ঘটছিল আমার চোখের সামনে। আমি কোনোমতে পাস করে যাচ্ছিলাম, ইংরেজি বলতে গেলে কিছুই পারতাম না। স্কুলের ফাইনাল পরীক্ষায় দুবার ফেল করায় সময়মতো কলেজে ভর্তি হতে পারিনি। কিন্তু বেশ বুঝতে পারছিলাম, বাবার কথা শুনে পড়াশোনা চালিয়ে যাওয়ার সিদ্ধান্তটা ভুল ছিল না।
‘দশম শ্রেণীতে উঠে পড়ার ফাঁকে আমি ম্যাজিক বাস নামের একটা এনজিওতে কাজ করা শুরু করলাম। তারা মুম্বাইয়ের বিভিন্ন এলাকায় গরিব ছেলেমেয়েদের বিভিন্ন বিষয়ে প্রশিক্ষণ দিত। আমি ছোটবেলা থেকেই ভালো ফুটবল খেলতাম। তাই ম্যাজিক বাসের হয়ে বিভিন্ন এলাকায় ছেলেদের ফুটবল প্রশিক্ষণ দেওয়া শুরু করলাম। আমি নিজের এলাকায় যা দেখেছি, অন্য এলাকার ছেলেদের সঙ্গে সেসব অভিজ্ঞতা বিনিময় করতে শুরু করলাম। তাদের বোঝালাম, পড়াশোনা বন্ধ করে দিলে শেষ পর্যন্ত কী পরিণতি হয়। একসময় আমি তাদের বললাম, আমি ফুটবল শেখাব এক শর্তে, আর তা হলো সবাইকে নিয়মিত স্কুলে যেতে হবে। হুমকিতে কাজ হলো, ছেলেরা প্রায় সবাই অন্তত খেলার লোভে হলেও স্কুলের ক্লাসে হাজিরা দিতে থাকল। সেই থেকে শুরু করলাম ফুটবলের মাধ্যমে ঝরে পড়া শিশু-কিশোরদের স্কুলে ফিরিয়ে আনা।’
এ সময়ে মাত্র ১৮ বছর বয়সে অশোক গড়ে তোলেন ‘অস্কার’ নামে একটি সংস্থা। ছয় বছর ধরে কঠোর পরিশ্রম করে প্রায় দেড় হাজার ঝরে পড়া শিশু-কিশোরকে স্কুলে ফিরিয়ে এনেছেন অশোক। বস্তিতে অস্কারের ছোট্ট অফিসের ভেতরে অশোক শুরু করেছেন দুর্বল শিক্ষার্থীদের জন্য ইংরেজি, গণিত ও কম্পিউটার শেখানোর ব্যবস্থা। একসময় ভাবলেন, বস্তির মেয়েরাই বা বাদ থাকবে কেন! ঘরে ঘরে গিয়ে বোঝানোর চেষ্টা করলেন। অবশেষে অনেক বাধাবিপত্তি পেরিয়ে মেয়েদের জন্য আলাদা ফুটবল দল গঠন করতে সক্ষম হলেন। এখন অস্কারের মেয়েরা অন্য প্রদেশে গিয়ে ফুটবল ম্যাচে অংশ নিচ্ছে, একজন খেলে এসেছে সুদূর আর্জেন্টিনায়।
অস্কার এখন মুম্বাইয়ের বস্তি ছাড়িয়ে কার্যক্রম চালিয়ে যাচ্ছে ভারতের ছয়টি প্রদেশে। সম্পূর্ণ অলাভজনক এই সংস্থা শুধু দেশে নয়, ছড়িয়ে পড়েছে বিদেশের মাটিতেও। যুক্তরাজ্য, হংকং ও নেপালে ইতিমধ্যেই নিবন্ধিত হয়েছে অস্কার। ২০০৯ সালে সিএনএন ও আইবিএন তাঁকে ‘রিয়েল হিরো অ্যাওয়ার্ড’ প্রদান করে।
সাফল্যের গল্প বলতে গিয়ে অশোক বলেন, ‘আমার পরিবারের কেউ কখনো প্লেনে চড়েনি। আর আমি এরই মধ্যে বিভিন্ন অনুষ্ঠানে অংশ নিতে ঘুরে এসেছি যুক্তরাজ্য, অস্ট্রেলিয়া, জর্ডান, ইন্দোনেশিয়া, মালয়েশিয়া, হংকং, কাতার, পেরু ও ব্রাজিল।’
অশোকের বয়স এখন মাত্র ২৪। নিজের প্রতিষ্ঠানকে গড়ে তোলা আর হাজার হাজার শিশু-কিশোকে উদ্বুদ্ধ করতে করতে সময় চলে যায় তাঁর। তবু পড়াশোনাটা ছেড়ে দেননি, আর্টস নিয়ে পড়ছেন মুম্বাই বিশ্ববিদ্যালয়ে। স্বপ্ন দেখতে ভালোবাসেন, স্বপ্ন দেখাতে ভালোবাসেন, আর ভালোবাসেন স্বপ্নকে বাস্তবে রূপ দেওয়ার জন্য দিনরাত কঠোর পরিশ্রম করতে। তাই তো তিনি বলেন, ‘বুকে সাহস থাকলে ঘুরে দাঁড়ানো কোনো ব্যাপারই না!’
Prothom-alo.com, 19/05/2013
No comments:
Post a Comment